ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে ক্রিটিক্যাল মিনারেল বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদাও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডি সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আনাদোলু।
সংস্থাটি বলছে, তামা, নিকেল, লিথিয়াম, কোবাল্ট ও বিরল মৃত্তিকা উপাদান এখন বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি), ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা সেন্টারের মতো খাতে এসব খনিজের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
ক্রিটিক্যাল মিনারেল মূলত এমন সব খনিজ, যার চাহিদা পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, তামা, গ্রাফাইট ও রেয়ার আর্থই মূলত ক্রিটিক্যাল মিনারেল হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ৫০টি খনিজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিরল খনিজ, নিকেল ও লিথিয়াম। এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রতিরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব দরকারি।
ইউএনসিটিএডির তথ্য অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে লিথিয়ামের চাহিদা ৩৫০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। একই সময় গ্রাফাইটের চাহিদা ১৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইভি ও জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এ চাহিদা বাড়ার প্রধান কারণ।
তবে এসব খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ইভির লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বাড়াতে একটি অপরিহার্য উপাদান কোবাল্ট। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট কোবাল্টের ৭৪ শতাংশ এসেছে আফ্রিকার কঙ্গো থেকে। অন্যদিকে বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্রাফাইট উত্তোলনের ৭৮ শতাংশের জোগান দিয়েছে চীন।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, চিলি ও চীন মিলে বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি লিথিয়াম উত্তোলন করে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খনিজ পরিশোধন বা রিফাইনিং কার্যক্রমেও চীনের আধিপত্য রয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ঝুঁকিও বাড়ছে। এ কারণে বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে বাণিজ্যনীতি ব্যবহার করছে। অনেক সরকার স্থানীয় খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
ইউএনসিটিএডি জানায়, ২০২০ সালের পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে প্রায় ১০০টি রফতানিসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রফতানি লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা, রফতানি কর এবং কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা।
সংস্থাটি বলছে, সাধারণত অনেক উন্নয়নশীল দেশ খনিজ শুধু উত্তোলন করেই অপরিশোধিত অবস্থায় সস্তায় বিদেশে রফতানি করে। কিন্তু নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব দেশ এখন খনিজ সম্পদ সরাসরি বিদেশে না পাঠিয়ে নিজ দেশেই প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে। ফলে একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ছে। কারণ প্রক্রিয়াজাত খনিজের ওপর কর বসালে সরকারের আয় বা রাজস্ব বেড়ে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও দ্রুত বাড়ছে। ইউএনসিটিএডির হিসাবে, বর্তমানে এ খাতে ৭৩টি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টিই ২০২২ সালের পর স্বাক্ষর হয়েছে।
জাতিসংঘের সংস্থাটি বলছে, এ প্রবণতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব দেশ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে ও খনিজভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারে।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় বিভিন্ন দেশ আলাদা আলাদা নিয়ম ও মানদণ্ড তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে ইউএনসিটিএডি। এতে একাধিক চুক্তি ও নীতির জটিল ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
সংস্থাটির মতে, এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসার ব্যয় বাড়তে পারে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেয়ার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাণিজ্যকে উন্মুক্ত এবং উন্নয়নবান্ধব রাখতে আরো সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছে ইউএনসিটিএডি।